অদ্বৈত মল্লবর্মনের বাড়ি, গোকর্ণ ঘাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
তিতাস নদীটা মল্লবর্মণকে যা দিয়েছে, অদ্বৈত তিতাসকে ফিরিয়ে দিয়েছেন তার চেয়ে ঢের বেশি। তিতাসের একটি ঘাট গোকর্ণ ঘাট। অদ্বৈত এখানে জন্মেছিলেন জানুয়ারির ১ তারিখে।
‘তিতাস একটি নদীর নাম। কূলজোড়া জল, বুকভরা ঢেউ, প্রাণভরা উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের ছন্দে সে বহিয়া যায়। ভোরের হাওয়ায় তার তন্দ্রা ভাঙে, দিনের সূর্য তাকে তাতায়; রাতের চাঁদ ও তারারা তাকে নিয়া ঘুম পাড়াইতে বসে, কিন্তু পারে না।’ লিখে গিয়েছেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ।
নাসিরনগরের চাতালপাড় গ্রামের পাশ দিয়ে বহমান মেঘনা থেকে জন্ম নিয়েছে তিতাস। তারপর বয়ে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ইতিউতি। ১৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পড়েছে আবার ওই মেঘনাতেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তিতাসপাড়ের গোকর্ণ ঘাট গ্রাম। এখন এটি একটি নৌবন্দর। এখান থেকে প্রতিদিন অনেক অনেক লঞ্চ, ট্রলার, ইঞ্জিনের নৌকা ও স্পিডবোট ছেড়ে যায় নবীনগরসহ আরো অনেক গন্তব্যে। গোকর্ণ ঘাট দেখতে নাকি গরুর কানের মতো! তাই এরূপ নামকরণ। তবে ভিন্ন মতও আছে ১৮৬৪ সালে ইংরেজ সাহেব পিট ও ক্লে, কুমিল্লা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এসেছিলেন নৌকায় চড়ে। চার দিন পর নৌকা ভিড়েছিল গোকূলে।
গোকূল থেকে গোকর্ণ। পিটের ডায়েরিতে গোকূল শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। মথুরার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে যমুনা তীরবর্তী গোকূলের কথা এখানে মনে পড়ে যায়। বৈষ্ণবদের কাছে স্থানটি কৃষ্ণের লীলাক্ষেত্র। এখানকার জেলেদের মধ্যেও ছিল বৈষ্ণব ভক্ত। কৃষ্ণ ভক্তরা হয়তো মথুরার অনুসরণেই জায়গাটির নাম দিয়ে থাকবেন গোকূল।
অদ্বৈত উপন্যাস লিখেছেন- একটি তিতাস একটি নদীর নাম। এতে তিতাসপাড়ের জনজীবনের কাহিনী ছাড়াও লোকজ আচার অনুষ্ঠানের বর্ণনা আছে। গোকর্ণ ঘাটের সামনেই বিস্তৃত তিতাস। বাম পাশে বাজার। ঘাটের দক্ষিণ-প্লিমে তিতাসের প্রবাহ বরাবর রয়েছে বিস্তীর্ণ নিম্নভূমি।
তিতাসের সমান্তরাল দীর্ঘ খালগুলো বর্ষাকালে জলমগ্ন থাকে। পুরো এলাকা তখন হাওরে রূপ নেয়। কূল দেখা যায় না। নবীনগর ও বাঞ্ছারামপুরের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এপথেই নৌ যোগাযোগ। ঘাটের অদূরেই সড়কের পাশে একটি আবক্ষ মূর্তি। অদ্বৈত মল্লবর্মণের। এটি উন্মোচন করেছেন কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাই। বাস্তবায়নে ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন। এর পেছনেই মালো পাড়া। অদ্বৈতর বাড়ি এখানেই ছিল। ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি গোকর্ণ ঘাট গ্রামের মালো পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবার নাম অধরচন্দ্র। বাবা-মা হারান শৈশবেই। বিধবা বোনটিও মারা যায় ২০ বছর বয়সে। চাচার আশ্রয়ে কাটিয়েছেন কৈশোরবেলা।
গোকর্ণ ঘাট গ্রামের এবং কাছেপিঠের মালোদের মধ্যে তিনিই প্রথম স্কুল পাঠ শেষ করতে পেরেছিলেন। গ্রামের লোকজন চাঁদা উঠিয়ে তাঁর পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছে। তিনি প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের এলিমেন্টারি স্কুল এবং পরে অন্নদা স্কুলে লেখাপড়া করেছেন। গোকর্ণ ঘাটের মালো পাড়া থেকে পাঁচ মাইল পায়ে হেঁটে তিনি অন্নদা স্কুলে যেতেন। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায়ই লিখতে শুরু করেন। বিশেষত কবিতা লিখেছেন এবং সেগুলো ম্যাগাজিনে প্রকাশ হয়েছে। অনেক পুরস্কারও পেয়েছেন। ১৯৩৩ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর যান কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে।
১৯৩৪ সালে কলেজের পড়ালেখা অসমাপ্ত রেখেই তাঁকে কলকাতায় চলে যেতে হয়। সেখানে তিনি প্রেমেন্দ্র মিত্রের নবশক্তি কাগজে কাজ পেয়েছেন। মাসিক মোহাম্মদীতেও কাজ করেছেন তিন বছর। আজাদ আর যুগান্তরেও ছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তাঁকে কোনো দিন ছাড়েনি। বই কেনার খুব বাতিক ছিল। অনেক পড়তেন।
এখন অদ্বৈতর নিকট-আত্মীয় কেউই আর গোকর্ণ ঘাট গ্রামে নেই। ভাই-বোনরা আগেই মারা গেছেন। নিজেও ছিলেন অকৃতদ্বার। পরে গোকর্ণ ঘাটের মল্লবর্মণ সমপ্রদায়ের অনেক মানুষ ত্রিপুরার সোনামুড়া মহকুমার রুদ্রসাগর হ্রদ এলাকায় উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। খুব অল্প কিছু মানুষ আছে এখন গোকর্ণ ঘাটে, বড়জোড় এক'শ পরিবার। কয়েকবার হাত বদল হয়ে তাঁর ভিটায় বর্তমানে অনিলচন্দ্র বর্মণ পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। পাকা ভিটি অনিলের। কালো আর নীল রং করা টিনের ঘর, চালও টিনের। অদ্বৈত মল্লবর্মণকর দেখেছেন এমন মানুষও নেই গোকর্ণ ঘাটে। অনিল বাবুর মা নাকি দেখেছেন তাঁকে! সমবয়সী ছিলেন তাঁরা।
তিনিও গত হয়েছেন অনেক আগে। মালো হয়েও অনিল বর্মণ মাছ ধরেন না। ‘তিতাসে তো মাছ নেই। যা আছে মহাজনরা ঘের দিয়ে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। তাই মাছের পেছনে ছুটলে কি সংসার চলবে?’ বলছিলেন অনিল। তাই অনেকেই বদলে ফেলেছেন পৈতৃক পেশা। কেউ নাপিত, কেউ দর্জির কাজ করেন। অনিল করেন বাবুর্চির কাজ।
১৯৫০ সালে অদ্বৈত যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। এক বন্ধুকে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর পাণ্ডুলিপিটা দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার অনেকদিন পরে আবার হাসপাতালে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে মাত্র ৩৭ বছর বয়সেই অদ্বৈত মৃত্যুবরণ করেন। উপন্যাসটির প্রথম প্রকাশের ভূমিকায় লেখা হয়েছিল ‘আমাদের বন্ধু অদ্বৈত দীর্ঘজীবী হয় নাই, হয়তো তাঁর তিতাসের কাহিনী দীর্ঘজীবী হইবে।’
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন